বেড়াল মাছের পাহারাদার? রাষ্ট্রপুঞ্জের সন্ত্রাসদমন কমিটিতে পাকিস্তানকে সহ-সভাপতি করায় উঠছে প্রশ্ন, নৈতিকতা নিয়ে চর্চা তুঙ্গে

Purulia (Somnath Gope) : রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের, সন্ত্রাস দমন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে পাকিস্তানকে সহ-সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করার সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে একপ্রকার ঝড় এর আবহ তৈরি হয়েছে, এমন একটি সিদ্ধান্তকে ঘিরে। যখন গোটা বিশ্ব জানে যে, সন্ত্রাসবাদ শুধু পাকিস্তানের মাটিতে শুধু আশ্রয় পায়নি, বরং রাষ্ট্রীয় মদতে লালিত পালিত হয়েছে। আর সেই পাকিস্তানই এখন রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক সংস্থায় সন্ত্রাসদমন কমিটিতে দায়িত্ব পেতে চলেছে— এই সংবাদে শুধু দিল্লি নয়, বিশ্বের বহু দেশই একরকম অস্বস্তিতে পড়েছে। সাধারণ ভাষায় বললে, এটি যেন ‘বেড়ালকে মাছ পাহারা দিতে পাঠানো’র মতো ঘটনা— যেখানে পাহারাদার নিজেই মাছের প্রধান শত্রু।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রপুঞ্জের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর নির্দিষ্ট কয়েকটি অস্থায়ী সদস্য দেশকে নিরাপত্তা পরিষদের অধীনে থাকা বিভিন্ন কমিটির দায়িত্বে বসানো হয়। এবার সেই প্রথাগত রোটেশন অনুযায়ী পাকিস্তানের ভাগ্যে এসেছে সন্ত্রাসবিরোধী কমিটির সহ-সভাপতির পদ। সভাপতির দায়িত্বে রয়েছে আলজেরিয়া, আর সহ-সভাপতির তালিকায় রয়েছে পাকিস্তানের পাশাপাশি রাশিয়া ও ফ্রান্স। বিষয়টি শুনলে হয়তো এটিকে একটা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু বাস্তব বলছে— কূটনৈতিক ভাবে এর প্রভাব ও তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর।ভারতের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই রাষ্ট্রপুঞ্জে জোরালো ভাবে আওয়াজ তুলে ধরা হয়েছে যে, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।
মুম্বই হামলা হোক কিংবা পুলওয়ামা বিস্ফোরণ, ভারতের সেনা জওয়ানদের উপর হওয়া একের পর এক হামলা, কাশ্মীর সীমান্তে ক্রমাগত অনুপ্রবেশ— প্রতিটি ঘটনার নেপথ্যে ছিল পাকিস্তানের মদতপুষ্ট জঙ্গি সংগঠনগুলি। শুধুমাত্র প্রশ্রয়ই নয়, পাকিস্তানের সামরিক ও গোয়েন্দা শাখা বহু ক্ষেত্রেই এই সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড গুলিকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে ভারতের বিরুদ্ধে। এই প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপুঞ্জের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত বিপজ্জনক ও হতাশা জনক। কারণ, যারা জঙ্গি সন্ত্রাসবাদে আক্রান্ত হয়েছে বারবার, যে দেশ জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও আপস করে না— সেই ভারতের প্রতিবেশী পাকিস্তানের মাটিতে রাষ্ট্রীয় মদতে সন্ত্রাসবাদ লালিত পালিত হয়েছে, সেই পাকিস্তান যদি আন্তর্জাতিক ভাবে এই দায়িত্ব পায়, তবে তা শুধু আন্তর্জাতিক মঞ্চের সন্ত্রাসবাদ বিরোধী অভিযানের এক ধরনের নৈতিক পরাজয় শুধু নয়, কূটনৈতিক তামাশাও বটে। অভিযোগ বহু দিনের— পাকিস্তান তার মাটিতে লস্কর-ই-তইবা, জইশ-ই-মহম্মদ, হিজবুল মুজাহিদিনের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলোকে শুধু আশ্রয় দেয়নি, বরং তাদের সংগঠিত হতে দিয়েছে। তাদের অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ সবকিছুই পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও আইএসআই-এর জড়িয়ে থাকা ছাড়া সম্ভবই নয়। আর সেই পাকিস্তান আজ রাষ্ট্রপুঞ্জে সন্ত্রাসবিরোধী কমিটির দায়িত্বে— তাতে অবাক হওয়াই স্বাভাবিক। প্রশ্ন খুব সোজা— “আপনি কি চোরকে থানার দায়িত্ব দেবেন?” বা “অপরাধীর হাতে বিচারকের আসন তুলে দেওয়া কি ন্যায়সঙ্গত?সন্ত্রাস বিরোধী আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারকদের কাছে ভারত বাস্তব তথ্য প্রমাণ তুলে ধরেছে বহুবার। তারপরও রাষ্ট্রপুঞ্জের এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় গণতন্ত্র ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতি একধরনের উদাসীনতা প্রকাশ করে বলেই মত কূটনৈতিক মহলের। এই পরিস্থিতিতে ভারতের বহু প্রয়াস, সন্ত্রাস দমন প্রস্তাব এবং বহু আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে বরাবরই ছিল— পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক ভাবে একঘরে করা। এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল 2021- 22 সাল, যখন ভারত নিজে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য ছিল এবং 2022 সালে সন্ত্রাসবিরোধী কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিল। সেই সময়ে ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান ছিল শক্তিশালী ও স্পষ্ট— যারা সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে, তাদের কোনও অবস্থান রাষ্ট্রপুঞ্জে পাওয়া উচিত নয়। কিন্তু আজ ঠিক উল্টো ছবি। যারা বারবার ভারতের মাটিকে রক্তাক্ত করেছে, তারা আজ আন্তর্জাতিক স্তরে মর্যাদা পাচ্ছে। বিষয়টা কেবল ভারতের পক্ষে অপমান জনক নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্যই এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। কারণ, রাষ্ট্রপুঞ্জ যদি এমন সিদ্ধান্ত নেয়— তবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নৈতিকতা কোথায় দাঁড়ায়? বিশ্বজুড়ে আজ যখন জঙ্গি হামলার হুমকি বেড়েই চলেছে, তখন রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো এক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার উচিত ছিল এমন কাউকে দায়িত্বে আনা, যাদের অতীত নির্ভরযোগ্য এবং সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট। সেখানে পাকিস্তানকে বেছে নেওয়ার অর্থ— শুধু বার্তা দেওয়ার ভুল নয়, নিরাপত্তা নিয়ে আপস করা। পশ্চিমা দেশগুলির নিজেদের কূটনৈতিক স্বার্থ, সামরিক অস্ত্রের বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বী ব্লকের জটিলতা, এবং তথাকথিত কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার রাজনীতির মধ্যেই পাকিস্তান আজ এই পদ পেতে সক্ষম হয়েছে। তবে বাস্তবতা এই যে, ভারতকে এখন থেকে আরও বেশি আন্তর্জাতিক লবিং করতে হবে। শুধু রাষ্ট্রপুঞ্জ নয়, বিভিন্ন ফোরামে, সম্মেলনে, দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে পাকিস্তানের ভণ্ডামি ও জঙ্গি পোষণ নীতির বিরুদ্ধে তথ্যভিত্তিক প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে। অপারেশন সিঁদুরের মতো সামরিক অভিযানের পাশাপাশি কূটনৈতিক মঞ্চেও ভারতকে এখন স্পষ্ট ও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
পাকিস্তানের ভাবমূর্তি যতই আন্তর্জাতিক মহলে চিত্রনাট্য সাজিয়ে তুলে ধরা হোক, ভারতের হাতে আছে বাস্তব প্রমাণ। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল—পাকিস্তানের মতো যে দেশ নিজেই সন্ত্রাসের মূল কেন্দ্র, তাকে সন্ত্রাস দমন কমিটির দায়িত্ব দেওয়া মানে বিশ্বের নিরাপত্তাকে আরও দুর্বল করে দেওয়া। ভারতের জন্য এটি শুধু কূটনৈতিক যুদ্ধ নয়, এক দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রাম। রাষ্ট্রপুঞ্জকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে— আপনারা কি চেনেন না কে অপরাধী, আর কে ভুক্তভোগী? এতদিন যারা নিজেদের শান্তির বার্তাবাহক বলে তুলে ধরেছে, আজ তাদের পরীক্ষার সময়। যদি সত্যিই রাষ্ট্রপুঞ্জ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আন্তরিক হয়, তবে এই সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনা জরুরি। নাহলে আগামী দিনে যদি সেই সহ-সভাপতির আসন থেকেই কোনও পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত আসে, তাহলে তার দায় কে নেবে? একটি রাষ্ট্র শুধু তার অতীত দিয়ে বিচার হয় না— হয় তার নীতিগত অবস্থান ও কার্যকলাপ দিয়ে। আর পাকিস্তান সেই পরীক্ষায় প্রতিবারই ফেল করেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের সামনে এখনও সময় আছে— চোরের হাতে চাবি তুলে দেওয়ার আগেই বুঝে নেওয়ার, কী ভয়ঙ্কর ভুল হতে চলেছে।





