রাসায়নিক মুক্ত চাষে জোর সরকারের, ‘প্রাকৃতিক কৃষি’ কর্মশালার আয়োজন কৃষি বিভাগের
Purulia (Somnath Hope): রাসায়নিক সারের দেদার ব্যবহার বন্ধ করে পুরুলিয়ার মাটিকে নতুন করে বাঁচিয়ে তুলতে আর বিষমুক্ত চাষবাসের এক নতুন দিশা দেখাতে বড় পদক্ষেপ করল সরকার। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কৃষি বিভাগের উদ্যোগে আজ, শনিবার পাড়া ব্লকের পাড়া কমিউনিটি হলে হয়ে গেল ‘প্রাকৃতিক কৃষি’ কর্মশালা। জেলা ও মহকুমা স্তরের বড় সরকারি আধিকারিকদের উপস্থিতিতে গাঁ-গঞ্জের চাষিদের নিজেদের পায়ে দাঁড় করাতে বর্তমান সরকার উদ্যোগী।
আজকাল জমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার আর রাসায়নিক বিষ দেওয়ার ফলে মাটির জোর যেমন কমে গেছে, তেমনই মানুষের শরীরেও দানা বাঁধছে মারাত্মক সব রোগ। এই বিপদ থেকে চাষিদের বাঁচাতে আর সাধারণ মানুষের পাতে বিষহীন পুষ্টিকর খাবার তুলে দিতে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘প্রাকৃতিক কৃষি’ বা সহজ স্বাভাবিক চাষ পদ্ধতির ওপর সবথেকে বেশি জোর দিচ্ছে। চাষের খরচ কমিয়ে চাষিদের লাভ বাড়ানো আর এই পরিবেশবান্ধব চাষ নিয়ে তাঁদের সচেতন করতেই এই বিশেষ শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল।
আজকের এই কর্মসূচীর আসল চমক ছিল আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে চাষিদের একেবারে সামনাসামনি হাতে-কলমে কাজ শেখানো। কর্মশালায় আসা শতাধিক চাষিকে প্রজেক্টরের পর্দায় ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে প্রাকৃতিক চাষের খুঁটিনাটি খুব সহজ-সরল ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া হয়। মাটি, জল, পোকা-মাকড়, গাছপালা আর মানুষের জীবন যে একে অপরের ওপর কতটা নির্ভরশীল, সেটাই এদিনের প্রশিক্ষণে পরিষ্কার করে বলা হয়েছে। গরুভিত্তিক চাষবাস, জীব-অমৃত আর বীজ-অমৃত তৈরি করে কীভাবে জমির ক্ষতিকারক রোগপোকা দূর করা যায় এবং ফসলের ফলন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব, তা প্রজেক্টরের মাধ্যমে চাষিদের চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলা হয়।
এদিনের বিশেষ কর্মশালায় প্রধান সরকারি আধিকারিক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পাড়ার সহ-কৃষি অধিকর্তা (এডিএ) মহম্মদ আজহারউদ্দিন। তিনি সরাসরি সরকারি সুযোগ-সুবিধা কীভাবে চাষিরা পাবেন, তা নিয়ে কথা বলেন। চাষিদের বৈজ্ঞানিক খুঁটিনাটি ও আধুনিক গবেষণার সুফল বোঝাতে উপস্থিত ছিলেন কৃষি বিজ্ঞানী ধীরেন চন্দ্র মাহাতো।
রঘুনাথপুর মহকুমার কৃষি বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত থেকে (এসএমএস) শুভেন্দু ঘোষ পুরুলিয়ার মাটির দশা নিয়ে এক কড়া বাস্তব ও উদ্বেগের তথ্য তুলে ধরেন। তিনি সরাসরি চাষিদের সতর্ক করে বলেন, বিজ্ঞানীরা বলেন, যে জমিতে জৈব কার্বনের মাত্রা 0.5 শতাংশের নিচে নেমে যায়, সেই জমি শুধু অনুর্বরই হয় না, তা আসলে মরুভূমি হয়ে যায়। আর আমাদের পুরুলিয়া জেলার অবস্থা কিন্তু খুবই খারাপ। এখানকার মাটিতে জৈব কার্বনের মাত্রা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র 0.3 শতাংশে। তার মানে, রাসায়নিক সারের অত্যাচারে আমাদের পুরুলিয়ার চাষের জমি একরকম শেষ হয়ে গেছে। এই মরণ দশা থেকে মাটিকে বাঁচাতে আর জমিতে আবার প্রাণ ফেরাতে বর্তমান সরকারের এই প্রাকৃতিক কৃষি প্রকল্প একদম সঞ্জীবনী সুধার মতো কাজ করবে বলে তিনি চাষিদের ভরসা দেন।
সরকারি আধিকারিক ও বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন এলাকার রাজনৈতিক নেতৃত্বও। উপস্থিত ছিলেন সদানন্দ বাউরি, শীতল নাগ, বিকাশ ব্যানার্জী এবং প্রসেনজিৎ ভট্টাচার্য। ব্লক এলাকার দুই মণ্ডল সভাপতি জয়দেব মন্ডল ও শিবশম্ভু বাউরি এবং মণ্ডল সাধারণ সম্পাদক দীনেশ চৌধুরী এই কর্মসূচিতে হাজির থেকে চাষি ভাইদের উৎসাহ দেন। শুধু আলোচনার মধ্যেই এই শিবির আটকে ছিল না। চাষিরা যাতে এই ট্রেনিং নেওয়ার পর পরই নিজেদের জমিতে প্রাকৃতিক উপায়ে চাষ শুরু করে দিতে পারেন, তার জন্য বর্তমান সরকারের তরফ থেকে তাঁদের হাতে বিশেষ ‘প্রাকৃতিক কৃষি কিট’ বা চাষের সরঞ্জাম তুলে দেওয়া হয়। সরকারের এই বড় সাহায্য আর আধুনিক ট্রেনিং পেয়ে এলাকার প্রান্তিক চাষির মুখে চওড়া হাসি দেখা গেছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুলিয়ার মতো জেলায় যেখানে চাষবাসের জন্য প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা আর জলের অভাবের সাথে চাষিদের বারো মাস লড়াই করতে হয়, সেখানে বর্তমান সরকারের এই বাস্তবমুখী প্রাকৃতিক কৃষি নীতি আগামী দিনে এক বড় বিপ্লব আনতে চলেছে। এতে চাষের খরচ যেমন একধাক্কায় প্রায় শূন্যে নেমে আসবে, তেমনই জেলার চাষিদের ঘরে আসবে পাকা লক্ষ্মী। আজকের এই কর্মশালাকে কেন্দ্র করে গোটা পাড়া ব্লক জুড়ে চাষিদের মধ্যে বর্তমান সরকারের কৃষি নীতির প্রতি এক অভূতপূর্ব ভরসা আর বিপুল আনন্দ লক্ষ্য করা যায়।



